ছবি:সংগ্রহ
আংটির ভেতর দিয়ে গলে গেল আস্ত একটি শাড়ি! এর চেয়ে আনন্দের দৃশ্য আর কী হতে পারে!
ঢাকাই মসলিনের শেষ প্রদর্শনী হয়েছিল লন্ডনে ১৮৫০ সালে। এর ১৭০ বছর পরে বাংলাদেশে আবার বোনা হলো সেই ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিন কাপড়ের শাড়ি। ঠিক সে রকমই, যেমনটি বলা হতো—আংটির ভেতর দিয়ে গলে যায় আস্ত একটি শাড়ি। ইতিমধ্যেই ঢাকাই মসলিনের জিআই স্বত্বের অনুমোদন পাওয়া গেছে। ২৮ ডিসেম্বর এ–সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়েছে।
প্রচলিত আছে, মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে দেওয়ার পরে ঢাকাই মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়। এখন ভারতেও মসলিন তৈরি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকাই মসলিনের বিশেষত্বই আলাদা।
তাই তো ঢাকাই মসলিন তৈরির জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলেন একদল গবেষক। তাঁদেরই ছয় বছরের চেষ্টা আর গবেষণা ফল দিয়েছে। তৈরি করা হয়েছে মসলিনের ছয়টি শাড়ি। যার একটি গবেষকেরা প্রধানমন্ত্রীকে উপহার হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু শুরুতে এক টুকরা ‘অরিজিনাল’ মসলিন কাপড় জোগাতে কলকাতা থেকে লন্ডন পর্যন্ত ছুটতে হয়েছে গবেষকদের। মসলিন বোনার সুতা যেই ‘ফুটি কার্পাস’ তুলার গাছ থেকে তৈরি হয়, সেই গাছ খুঁজে বের করা হয়েছে বিচিত্র সব পন্থা অবলম্বন করে। যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে এসেও এই শাড়ি তৈরিতে তাঁতিদের হাতে কাটা ৫০০ কাউন্টের সুতাই ব্যবহার করতে হয়েছে। কাপড়ও বোনা হয়েছে হস্তচালিত তাঁতেই
২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় মসলিন সুতা তৈরি হতো, তা জেনে সে প্রযুক্তি উদ্ধারের নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্যান্য সদস্য হচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেন, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ আলীমুজ্জামান, বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত পরিচালক মো.আখতারুজ্জামান, বিটিএমসি ঢাকার মহাব্যবস্থাপক মাহবুব-উল-আলম, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উপমহাব্যবস্থাপক এ এস এম গোলাম মোস্তফা ও সদস্যসচিব করা হয় তাঁত বোর্ডের জ্যেষ্ঠ ইনস্ট্রাক্টর মো. মঞ্জুরুল ইসলামকে। পরে গবেষণাকাজের স্বার্থে আরও সাত সদস্যকে এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়। তাঁরা হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বুলবন ওসমান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এম ফিরোজ আলম, অ্যাগ্রোনমি অ্যান্ড অ্যাগ্রিল বিভাগের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. আইয়ুব আলী ও বাংলাদেশ রেশম গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রাজশাহীর গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুল আলিম।
পুরো গল্পটিই রুদ্ধশ্বাস দুর্দান্ত। ঢাকাই মসলিনের তুলাগাছ ঠিক কোনটা, কোথায় সেই গাছের বীজ পাওয়া যাবে, কীভাবে তুলা থেকে সুতা হবে, সেই সুতা কীভাবে বুনতে হবে, সেই স্কিল কাদের আছে, কোনরকম তথ্যই শুরুতে ছিল না! এক্সপার্টরা ঘাঁটাঘাঁটি করে একটি স্কেচ তৈরি করলেন তুলাগাছ দেখতে কীরকম, সেই স্কেচ প্রচার করা হল, যদি বন্য অবস্থায় হলেও তুলাগাছটি খুঁজে পাওয়া যায়! কাপাসিয়ায় এক ভদ্রলোক জানালেন এরকম গাছ আছে ওখানে, গবেষকরা নমুনা আনলেন। কিন্তু এটাই যে ঠিক গাছ শিওর হবেন কীভাবে? অরিজিনাল ঢাকাই মসলিনের স্যাম্পল তো হাতের কাছে নেই। বহু যন্ত্রণার পর লন্ডনের মিউজিয়াম থেকে নমুনা আনা হল, ডিএনএ তুলনা করে শিওর হওয়া গেল যে গাছ ঠিকঠাক, সেই গাছ চাষও করা হল রাজশাহীতে। ভালো কথা, কিন্তু তুলা থেকে সুতা হবে কী করে? কুমিল্লায় কারিগর পাওয়া গেল যারা ১০ ‘কাউন্টের’ মোটা সুতা তৈরি করেন, অথচ দরকার ৫০০ কাউন্ট! সেই সুতা তৈরিতে তিন আঙুলের কারিশমা প্রয়োজন, আর সেই আঙুল হতে হবে একেবারে নমনীয়। কারিগরদের আঙুলে সারারাত লোশন মেখে সকালে সুতা কাটার কাজ করা হল, ধীরে ধীরে একটি দল দাঁড়িয়ে গেল যারা ৩০০ কাউন্টের সুতা তৈরি করতে পারছেন। একেবারে হয়তো মিললো না, কিন্তু কিছু তো এগুলো। এবার শাড়ি বুনবেন কীভাবে? এক্সপার্ট তাঁতি খুঁজে বের করা হল, আর্দ্রতা ঠিক রাখার জন্য মাটির গর্তে তাঁত বসানো হল, সুতা বারবার ছিঁড়ে যাওয়া রোধ করার জন্য বালতিতে পানি রেখেও কাজ করা হল। তৈরি হল মসলিনের শাড়ি!
এদিকে এই প্রজেক্ট ১৪ কোটি টাকা বাজেট নিয়ে শুরু করে মাত্র সোয়া চার কোটিতে পুরোটা এগিয়ে নিতে পেরেছে, বাকি টাকার সিংহভাগ সরকারকে ফেরতও দিয়েছে।
Leave a Reply